ক্রীপ্টোকারেন্সি কী?
kripto এসেছে kriptos থেকে৷ অর্থ: গোপন, লুকায়িত, অদৃশ্য। currency অর্থ : মুদ্রা। সুতরাং ক্রিপ্টোকারেন্সি অর্থ দাঁড়াল, গোপন / অদৃশ্য মুদ্রা।
এটি এমন একটি মুদ্রা, যা লুকিয়ায়িত থাকে, এবং তা অদৃশ্য সংকেত কিংবা নাম্বারের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মূলত ক্রিপ্টোগ্রাফি টেকনিক ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।
ক্রিপ্টোধারণা: ১৯৮০ সালের শেষের দিকে ক্রিপ্টোধারণা প্রকাশ পায়। এবং এটি বাজারে আসে ২০০৯ সালে। সাতোশি নাকামোতো (ছদ্ম নাম)নামক এক বৈজ্ঞানিক ২০০৯ সালে সেটা আবিষ্কার করে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বিভিন্ন ধরণের হতে পারে।
১- ডিজিটাল কারেন্সি।
সকল ইলেকট্রনিক মানি ডিজিটাল কারেন্সি। সেটা হোক ভার্চুয়াল কারেন্সি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সি।
ডিজিটাল কারেন্সিকে ধরা ছোঁয়া যায় না। এটাকে শুধু নেটওয়ার্কেই ব্যাবহার করা যায়। এবং এর মালিকানা লাভ করা যায়।
২- ভার্চুয়াল কারেন্সি।
এটা ডিজিটাল কারেন্সির একটা ধরন। এটাকে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা যায়। সকল ভার্চুয়াল কারেন্সি ডিজিটাল কারেন্সি, কিন্তু সকল ডিজিটাল কারেন্সি ভার্চুয়াল কারেন্সি নয়।
৩- ই- মানি।
এটা মনিটারি ভ্যালু সংরক্ষণ করে৷ যেমন, মেট্রোরেলের কার্ড ইত্যাদি৷ ই-মানি ব্যাংকের মাধ্যমে ইস্যু হয় না। এগুলো ই-মানি প্রতিষ্ঠান ইস্যু করে৷
ক্রিপ্টো ২ ধরণের:
১- Asset free kripto. যেমন, বিটকয়েন, ইথারিয়াম, লাইটকয়েন ইত্যাদি।
২- Asset blacked kripto.
যেমন, নিরাপত্তা টোকেন।
ক্রিপ্টো এসেট ও কারেন্সিসমূহ ভার্চুয়াল কারেন্সি হিসেবে ব্যাবহার হয়। প্রাইভেট কি ও পাবলিক কি’র মাধ্যমে পিয়ার টু পিয়ার লেনদেন নিশ্চিত করে। ক্রিপ্টো বিভিন্ন ধরণের কারেন্সিকে নির্দেশ করে। যেমন বিয়কয়েন।
বিটকয়েন কী?
এটা অন্যান্য মুদ্রার মত একটা মুদ্রা। তবে এটা ডিজিটাল মুদ্রা। এটা একটা সফটওয়্যার হিসেবে নেটওয়ার্কে থাকে। এবং মুদ্রার প্রয়োজনীয় সব গুণাবলীও তার মাঝে আছে। কেউ কেউ এটাকে ইন্টারনেট মুদ্রাও বলে থাকেন।
বিটকয়েনের টোকেন ব্যালেন্স প্রাইভেট ও পাবলিক কির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়৷
‘পাবলিক কি’ ব্যাংক একাউন্টের মত সবার কাছে উন্মুক্ত। এবং ‘প্রাইভেট কি’ এটি এম কার্ডের মত গোপন থাকে। এটা অন্যান্য সম্পদের মত একটা সম্পদ৷ কিন্তু এর প্রচলনের উদ্দেশ্য হলো এটাকে মুদ্রা হিসেবে ব্যাবহার করা।
ক্রিপ্টোকারেন্সিকে সম্পদ বলা হয় একারণে যে, এটা মুদ্রা সংরক্ষণ করতে পারে। এবং একে নগদ অর্থে রুপান্তর করা যায়। নির্দিষ্ট সময় ধরে ব্যবহার করা যায়। এটা কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। দ্রুত গতিতে এর দ্বারা লেনদেন করা যায় এবং ফি কম লাগে।
বিটকয়েন মূলত মুদ্রা। কিন্তু এর দামের কারণে মানুষ তাকে সম্পদ ভাবা শুরু করেছে৷ এর মূল্য বাড়ার পিছনে কারণ রয়েছে। যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়েও বেশি প্রযুক্তিক ও বৈজ্ঞানিক। বলা হয়, সামনে হয়তো কাগজের মুদ্রা থাকবে না। সব ক্রিপ্টোমুদ্রা হয়ে যাবে।
বিটকয়েনের ব্যবহার : কোনো পণ্য এবং সার্ভিসের বিপরীতে পেমেন্ট করা যায়।
বিটকয়েন কিভাবে তৈরী হয়?
এটা তৈরী হয় কতগুলো ব্লকচেইন তৈরীর মাধমে।
ব্লকচেইন হল একটা প্রযুক্তি যার উপর ভিত্তি করে ক্রিপ্টো মুদ্রার আবিষ্কার হয়েছে। এটি কোন কারেন্সি নয়। এটা একটা সফটওয়্যার। একটা অনলাইন ডিজিটাল লেজার। বই এবং ডকুমেন্ট এর মত। যেখানে তথ্য রেকর্ড ও সংরক্ষন করা হয়। ব্লক-চেইন হলো, কতগুলো লেনদেন বা ব্লকের সমষ্টি। এটি ব্যবহারকারী প্রতিটি ব্যক্তির পরিচয় কোডের পিছনে লুকিয়ে থাকে।
একটা ব্লকচেইন তৈশ্রী করতে কতগুলো গাণিতিক সমস্যার সমাধীন করতে হয়। যাকে বলে প্রুফ অফ ওয়ার্ক। প্রুফ অফ ওয়ার্ক যারা করে তাদেরকে বলা হয় মাইনার।
একটার সাথে আরেকটার তথ্যের হ্যাশ ঢোকানো আছে। এভাবে একটা চেইন বা শৃঙ্খল গঠিত হয় বলেই এর নাম ব্লকচেইন।
– প্রতিটি লেনদেন ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ থাকে। মানুষ কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম থাকেনা।
মাইনার রা যখন ব্লকচেইন তৈরী করে, তখন নিজেদের মাঝে প্রতিযোগিতা করে। এর জন্য লাগে শক্তিশালী কম্পিউটার। যখন কোনো মাইনার ব্লক তৈরী করে চেইনে যুক্ত করতে পারবে তখন সে পুরস্কার হিসাবে বিটকয়েন পায়। এভাবেই বিট কয়েন তৈরী হয়।
বিটকয়েনের মূল্য ব্যাপকভাবে উঠানামা করে। স্থির থাকে না। শক্তিশালী মেশিন ব্যাবহার করে বিটকয়েন হ্যাক করা যায়। তবে নির্ভুল সাংকেতিক কি ব্যবহার করে এটাকে নিরাপদ করা সম্ভব। (বর্তমান মূল্য? কেন বাড়ে?
বিনিয়োগের ক্ষোত্র বিটকয়েন ঝুঁকির বিষয়। অন্য একটি মুদ্রা এগিয়ে এসে একে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দিতে পারে।
বিট কয়েন দিয়ে লেনদেনের জন্য একটা ওয়ালেট থাকতে হবে এর জন্য চাবি লাগবে। এটা হারিয়ে গেলে বিটকয়েন ব্যবহার করা যাবে না।
(সর্ব প্রথম ব্লকচেইনের নাম হল- জেনসিস ব্লক- অর্থ, সূচনা, যেখান থেকে ব্লকচেইনের প্রথম ব্লকের সৃষ্টি।)
ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেনের শরয়ী বিধান:
ক্রিপ্টোকারেন্সির মাসাআলা বর্তমানে আধুনিক মুয়ামালার মাসাআলা সমূহের শীর্ষে রয়েছে। এ বিষয়ে আলেমদের মতামতসমূহকে আপাতত তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১- ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন বৈধ। এ মতের প্রবক্তা হলেন ডক্টর মিয়াদাহ মুহাম্মাদ হাসান, ড. ফারায আদাম প্রমুখ উলামায়ে কেরাম। তাদের মতে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে সাধারণত মুদ্রার বৈশিষ্ট্য তথা সম্পদ হওয়া, নগদীকরণ ক্ষমতা এবং মূল্যমান সম্পন্ন হওয়া এসব পাওয়া যায়, তাই ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন বৈধ ।
২- ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অবৈধ। এ মতের প্রবক্তা হলেন জাস্টিস আল্লামা মুফতি তাকি উসমানী হাফি.। এ ছাড়া দারুল উলুম যাকারিয়্যা, দারুল উলুম দেওবন্দ, জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়া বিনূরী টাউনের ফতোয়া বিভাগ এবং মিশরের কেন্দ্রীয় ফতোয়া বিভাগ সহ অসংখ্য ফতোয়া বিভাগ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনকে অবৈধ বলা হয়েছে। তাদের মতে কোনো কিছু কারেন্সি হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার জন্য মৌলিক যেসব শর্ত, যেমন- প্রতারণা না থাকা, মানুষ নিরাপদে আস্থার সাথে লেনদেন করতে পারা, ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং দেশীয় আইনে তা স্বীকৃত হওয়া ইত্যাদি শর্ত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অনুপস্থিত। তাই এর লেনদেন বৈধ হবে না।
৩- সমকালীন উলামায়ে কেরামের কেউ কেউ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ইসলামি ফিকহ একাডেমি জেদ্দাহ, এবং শায়খ সালেহ আল মুনাজ্জিদ, ড. আহমদ হাদ্দাদ প্রমুখ উলামায়ে কেরাম।
সুতরাং এখন পর্যন্ত শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি স্পর্শকাতর হিসেবেই দেখতে হচ্ছে । তাই যথাসম্ভব ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় এবং লেনদেন থেকে বিরত থাকা উচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি যেহেতু সরকারিভাবে স্বীকৃত ও অনুমোদিত নয়, তাই শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকেই বাংলাদেশে এর লেনদেন থেকে বিরত থাকা উচিত। কেননা শরীয়তের বিধান হল, বৈধ বিষয়ে রাষ্ট্রের আনুগত্য করতে হবে। এর জন্য রাষ্ট্র ইসলামী হওয়া জরুরী নয় ।
মুস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। Student: Centre for Islamic economic studies ১১-৭-২৬ ঈ.।
Rezaul Karim Abrar